গণমত

হাত ও কব্জির ব্যথার রোগ: কারপাল টানেল সিন্ড্রোম

0Shares

কমপিউটারে কাজ করছেন, লিখছেন বা গাড়ী চালাচ্ছেন? বেশ কিছুদিন হল হাত, তালুতে, বুড়ো আঙ্গুলে ব্যাথা ঝিন ঝিন অবশ ভাব অনুভব করছেন?মাঝে মাঝে ইলেক্ট্রিক শকের মত ব্যাথা জিলিক মেরে হাত থেকে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে?রাতে ব্যাথা বেড়ে ঘুম ভেংগে যায়? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়,আপনি খুব সম্ভবতঃ কারপাল টানেল সিন্ড্রোম রোগে ভুগছেন। হাত ও কব্জির ব্যাথার রোগ কারপাল টানেল সিন্ড্রোম।নামটা যত বড় রোগটা তত ভয়ঙ্কর নয়, তবে এই রোগের রোগীর সংখ্যা কিন্তু নেহায়েত কম নয়।

কারপাল টানেল সিন্ড্রোম(Carpal Tunnel syndrome) কি?

টানেল কথাটার বাংলা মানে সুড়ঙ্গ। কারপাল টানেল হল কারপাল হাড়এর সামনের সুড়ঙ্গ। আমাদের কব্জির হাড় গুলোকে এক সাথে বলা হয় কারপাল বোন(Carpal Bone) বা হাড়। মোট আটটা ছোট ছোট হাড় দুই সারিতে অর্ধ বৃত্তাকারে সাজান থাকে যার দুই প্রান্ত বাঁধা থাকে রশির মত লিগামেন্ট(Flexor Retinaculum) দিয়ে।পেছনে হাড় আর সামনে লিগামেন্ট, অনেকটা ধনুকের মত দেখতে এই সুড়ঙ্গই হল কারপাল টানেল।এই সুড়ঙ্গএর মধ্য দিয়েই রগ(Tendon) ,রক্ত নালী(Artery), নার্ভ(Nerve) ইত্যাদি উপর থেকে হাতের ভিতরে ঢোকে।সুড়ঙ্গের মধ্যে গাদাগাদি করে থাকে এ গুলো ,একটার সাথে আরেকটা। একদম জায়গা নেই সুড়ঙ্গে,একেবারে টাইট যাকে বলে। মিডিয়ান নার্ভ(Median Nerve) এই সুড়ঙ্গের বাসিন্দা যা কিনা আমাদের হাতের বুড়ো আঙ্গুল এবং পাশের তিনটে আঙ্গুলের অনুভুতি এবং বুড়ো আঙ্গুলের কিছু মাংশ পেশীকে নিয়ন্ত্রন করে থাকে।কোন কারনে যদি এই মিডিয়ান নার্ভের উপর চাপ পড়ে তাহলে বুড়ো আঙ্গুল ও তার পাশের আঙ্গুল তিনটেতে ব্যাথা ঝিন ঝিন অবশ ভাব এবং মাংশপেশীর দুর্বলতা দেখা দিতে পারে আর এটাই হল কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম। নার্ভের রোগ নয় এটি ,নার্ভের উপর চাপ পড়া রোগ।

কারনঃ-
১)মিডিয়ান নার্ভের উপর চাপ পড়ার কারন অনেক ক্ষেত্রে নির্নয় করা সম্ভব হয় না আমরা যাকে বলি ইডিওপ্যাথিক(Idiopathic)।

২) জন্মগত(Congenital):- জন্মগতভাবে এই সুড়ঙ্গ সংকীর্ন থাকে রোগীদের মধ্যে।

৩)বয়সঃ-বয়স কালের রোগ এটি। সবচে বেশী দেখা যায় ৩০-থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত।

৪)লিংগ:- মহিলাদের বেশী হয়। আনুপাতিক হারে পুরুষদের চেয়ে ৩ গুন বেশী দেখা যায় মহিলাদের মধ্যে, সম্ভবতঃ সুড়ঙ্গ সরু থাকার কারনে।

৫) পেশাঃ- যে সমস্ত পেশায় হাতের ব্যাবহার বেশী করতে হয় যেমন কম্পিউটারে কাজ, টাইপ রাইটারে কাজ, বাদ্যযন্ত্র বাদক(Musician), সেলাই বা কম্পমান যন্ত্র(Vibrating tools) যেমন ড্রিল মেসিন ব্যবহার ইত্যাদি।

৬) কব্জীতে আঘাত বা ফ্রাকচারের(Fracture) পর ও হতে পারে।

৭)অনান্য রোগ থাকলেও দেখা যায় রোগটি।এদের মধ্যে সবচে বেশী হল ডায়াবেটিস(Diabetes)।অনেকের গর্ভবতি(pregnancy) অবস্থায় দেখা যায় শরীরে পানি বাড়ার কারনে।রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস(Rheumatoid arthritis), এক্রোমেগালি(Acromegaly),থাইরয়েড হরমোন স্বল্পতা(Hypothyroidism), টিউমার(Tumour), বা সিস্ট(Cyst) হলে।

উপসর্গ ও লক্ষন-
• ধীরে ধীরে শুরু হয় উপসর্গ গুলো।
• হাতের তালু, বুড়ো আঙ্গুল ও তার পাশের আঙ্গুল ৩টে নিয়ে পুড়ে যাওয়ার মত ব্যাথা, ঝিন ঝিন, শির শি্র, অবশ ভাব প্রধান।
• অনেক রোগী আঙ্গুল ফুলে যাওয়া বললেও ফোলা খুব একটা বেশী দেখা যায় না।
• সাধারনতঃ প্রথম শুরু হয় ডান হাতে পরে অন্য হাতেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
• শুরু হয় রাতের বেলা, মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়,উঠে হাত নাড়াচাড়া করতে হয়। আস্তে আস্তে উপসর্গ গুলো দিনের বেলাও শুরু হয়।
• হাত দিয়ে ছোট জিনিস ধরতে বা জোরে ধরতে অসুবিধা হয়।
• চিকিৎসা না করলে বুড়ো আঙ্গুলের মাংশপেশী শুকিয়ে যায় এবং হাত অকেজো হয়ে ওঠে।

ডায়াগনোসিসঃ-
বিস্তারিত পরীক্ষা যেমন হাতের অনুভুতি, মুঠি করার শক্তি,হাতের কবজি নেড়েচেড়ে, কবজীর সামনে টোকা বা চাপ দিয়ে ডাক্তাররা বুঝতে পারেন।
পরীক্ষাঃ-
১) ইলেক্টোমায়োগ্রাফী নার্ভ কনডাকশান স্টাডিঃ-(Electromyography and Nerve Conduction study)প্রধান নির্গরযোগ্য পরীক্ষা এটি।কব্জির সামনে মিডিয়ান নার্ভের চাপ পড়ার কারনে নার্ভের গতি কমে যাওয়া নার্ভ কন্ডাকসান ভেলোসিটি পরিক্ষা তে ধরা পড়ে এবং কতটা চাপ পড়ছে, গতি কমার পরিমান দিয়ে তা অনুমান করা যায়।
২)ডায়াবেটিসের জন্য রক্তের গ্লুকোজ,(Blood Glucose)
৩) হাত ও কব্জীর এক্স রে(X-ray)।
৪) কব্জীর আল্ট্রাসনোগ্রাফী(Ultarsonography)
৫) অনান্য পরীক্ষা যেমন লিভারের বা হরমোনের পরীক্ষা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর দরকার পড়ে।

চিকিৎসাঃ-
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা উচিৎ। বেশী দেরী করলে নার্ভের উপরের চাপের কারনে তার স্থায়ী ক্ষতি হাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১) ব্যাথার ঔষধ,(Analgesics, NSAIDs)
২) প্রস্রাব বেশি হওয়ার ঔষ্ধ(Diuretic)
৩) স্টেরয়েডঃ-স্টেরয়েড ঔষধ যেমন মিথাইল প্রেডনিসোলন(methyl prednisolone),ট্রাইএমসিনোলোন (Traimcinolone) ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে সরাসরি কব্জীর সামনে দেওয়া হয়। রোগের প্রথম দিকে উপকারী।
৪) ব্রেসঃ- হাতে রেস্টিং হ্যান্ড স্পিলিন্ট(Resting Hand Splint) ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়।
৫)ভিটামিন বি৬,
৬) ব্যায়াম(Eexericse)
৭) ফিজিওথেরাপীঃ- আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপী ব্যাথা নিরাময়ে সহায়ক।
৮) ৫০% ভাগ রোগির অপারেশানের দরকার পড়ে । অপারেশান করে টানেলের সামনের লিগামেন্ট কেটে দিলে নার্ভের উপর চাপ থাকে না। দুইভাবে অপারেশান করা যেতেপারে।এন্ডোস্কোপ যন্ত্রের সাহায্যে(Endoscopic) বা ব্লেড দিয়ে কেটে(Open Operation)। এন্ডোস্কোপ যন্ত্রের সাহায্যে করা অপেক্ষাকৃত ভাল। রোগী তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভ করেন এবং ব্যাথা ও কম পান।অজ্ঞান করার দরকার পড়ে না এবং স্থানটা অবশ করে(Local Anesthetic) অপারেশান করা সম্ভব।
উপদেশঃ-
ওজন বেশীথাকলে ওজন কমান
অনান্য রোগের চিকিৎসা করান
বার বার হাত ব্যবহার করতে হলে হাতের কবজি সামনে বাকিয়ে করবেন না।
বাহু শরীরের থেকে খুব বেশী দূরে বা কাছে রেখে অধি্কক্ষন কাজ করবেন না।
কম্পিউটারে কাজ করার সময় কি বোর্ড এবং হাত একই উচ্চতায় রাখুন যাতে কবজি না বাকিয়ে কাজ করতে পারেন।
কাজ করার সময় এক হাত দিয়ে তা না করে অদল বদল করে অন্য হাত ও ব্যবহার করুন।
কিছুক্ষন পরপর হাত ও কব্জির বিশ্রাম দিন।
দীর্ঘ সময় এক অবস্থানে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকবেন না।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

To Top